22 September 2026 Tuesday, 03:32 PM
৭ আশ্বিন ১৪৩৩ মঙ্গলবার, 03:32 PM
155, Jalil Sharoni, Rayermohol, Boyra, Khulna 9000
+880 1915 319448  |  info@shushilan.com
ব্রেকিং নিউজ

ভাঙ্গা স্বপ্ন থেকে জেগে ওঠা কল্পনা

21 September 2026 05:17 PM 13 ভিউ নাদিয়া আফরিন প্রকল্প সমন্বয়কারী

জীবনের কঠিন বাস্তবতা অনেককে থামিয়ে দেয়, কিন্তু কিছু মানুষ আছেন যারা প্রতিকূলতাকেই শক্তিতে পরিণত করে এগিয়ে যান। তেমনই এক অনুপ্রেরণার নাম—কল্পনা রানী।

কল্পনা রানী (৩৪) পটুয়াখালী জেলার গলাচিপা উপজেলার গোলখালী ইউনিয়নের বদরপুর গ্রামের একজন সংগ্রামী ও আত্মপ্রত্যয়ী নারী। ১৯৮৯ সালে বরিশাল জেলার নলছিটি উপজেলার আমিরাবাদ গ্রামের এক দরিদ্র পরিবারে তার জন্ম। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। অভাব—অনটনের মধ্যেও তিনি স্বপ্ন দেখতেন—শিক্ষিত হবেন, নিজের পায়ে দাঁড়াবেন। সেই স্বপ্ন বুকে নিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে গেলেও, জীবনের মোড় ঘুরে যায় হঠাৎই।

২০০৮ সালে, যখন তিনি দশম শ্রেণির ছাত্রী, তখনই তার বিয়ে হয়ে যায় পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার বদরপুর গ্রামের এক পরিশ্রমী ব্যবসায়ী শুকরঞ্জন দাসের সঙ্গে। তার স্বামী পুরাতন জাল কিনে মেরামত করে বিক্রি করতেন। খুব বেশি সচ্ছলতা না থাকলেও সংসারে ছিল শান্তি ও স্বস্তি—তিনবেলা খাবার, ছোট ছোট স্বপ্ন আর ভালোবাসার বন্ধন।

বিয়ের চার বছর পর তাদের ঘর আলো করে জন্ম নেয় একমাত্র সন্তান—শুভংকর দাস শুভ। সুখের এই ছোট্ট পৃথিবী হঠাৎই ভেঙে পড়ে, যখন শুভ তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় স্ট্রোকে মারা যান তার স্বামী। এক মুহূর্তেই বদলে যায় সবকিছু। সংসারে তখন চারজন সদস্য—ছোট ছেলে, বৃদ্ধ শ্বশুর—শাশুড়ি এবং কল্পনা রানী নিজে। জীবনের কঠিন দায়িত্ব একাই তুলে নিতে হয় তার কাঁধে।

অভাব তখন নিত্যসঙ্গী। কখনো খেয়ে, কখনো না খেয়ে দিন পার করতে হয়েছে। জীবিকা নির্বাহের জন্য তিনি মানুষের বাড়িতে কাজ করেছেন, কখনো ঝিয়ের কাজ, কখনো যে কাজ পেতেন তাই করতেন। চোখে ছিল অশ্রু, কিন্তু মনে ছিল অদম্য সাহস।

এই সংগ্রামের মাঝেই ২০২৪ সালে “সুশীলন স্বপ্ন প্রকল্প” যেন তার জীবনে আশার আলো হয়ে আসে। সকল নিয়ম মেনে তিনি প্রকল্পে যুক্ত হন এবং মাটির কাজসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। খুব অল্প সময়েই তার কাজের প্রতি নিষ্ঠা, দায়িত্ববোধ এবং নেতৃত্বগুণ সবার নজর কাড়ে।

তিনি শুধু নিজে কাজ করেই থেমে থাকেননি—দলের অন্য সদস্যদের কাজ বুঝিয়ে দেওয়া, নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী কাজ সম্পন্ন করা—সবকিছুতেই তিনি ছিলেন অনন্য। তার এই দক্ষতার স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে দলনেতার দায়িত্ব দেওয়া হয়।

এই কাজ থেকে প্রাপ্ত আয়ের একটি অংশ তিনি নিয়মিত সঞ্চয় করতে শুরু করেন। পাশাপাশি দলের সদস্যদের সঙ্গে ৫০০ টাকা করে রোসকা (সঞ্চয় কার্যক্রম) চালু করেন। সেই রোসকা থেকে প্রাপ্ত ৬,০০০ টাকা এবং নিজের সঞ্চয়ের অর্থ দিয়ে, ইউনিয়ন ওয়ার্কার মানসুরা বেগমের অনুপ্রেরণায়, শ্বশুরের সহযোগিতায় তিনি শুরু করেন নিজের স্বপ্নের পথচলা।

নিজের পূর্বের শেখা হাতের কাজ—কুটির শিল্পকে ভিত্তি করে তিনি বাড়িতেই ছোট পরিসরে কাজ শুরু করেন।

আজ কল্পনা রানী একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা। তিনি বাঁশ ও বেত দিয়ে কুলা, ডালা, পোলো এবং পাটের তৈরি গরুর মুখল, তুড়ি ও রশি তৈরি করেন। শুরুতে স্থানীয় বাজারে পাইকারি বিক্রি করলেও, তার পণ্যের গুণগত মান ও নকশার কারণে দ্রুত চাহিদা বাড়তে থাকে। বর্তমানে তার তৈরি পণ্য শুধু স্থানীয় বাজারেই নয়, আশেপাশের হাট—বাজারেও সরবরাহ করা হচ্ছে। ধীরে ধীরে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করছেন একজন আত্মনির্ভরশীল নারী উদ্যোক্তা হিসেবে।

কল্পনা রানীর এই যাত্রা শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়—এটি সাহস, ধৈর্য, পরিশ্রম এবং সঠিক দিকনির্দেশনার এক অনন্য উদাহরণ।

তিনি প্রমাণ করেছেন—“অভাব কখনোই একজন মানুষের স্বপ্নকে থামিয়ে দিতে পারে না,যদি থাকে অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর এগিয়ে যাওয়ার সাহস”।

কল্পনা রানী আজ শুধু নিজের জীবনই বদলায়নি, তিনি হয়ে উঠেছেন আশেপাশের অনেক নারীর জন্য অনুপ্রেরণার বাতিঘর।

সংগ্রামী নারীর গল্প সংখ্যা: ৩
ব্যাঘ্রতট - সুশীলন মুখপাত্র